মতান্তরে ফুসমন্তর

[অকথা]

রাত্রিটা একটু বেশি হয়ে গেলেই কুয়াশার ধোয়াটে আলোতে হঠাৎ চাঁদ যদি তোমার চোখ ছিনিয়ে নেয়? কি হবে? কিছু মুহূর্ত তখন ওলিগলিতে মুনপিক্সি খোঁজায় ব্যস্ত। কানে স্যাটরিয়ানির নম্বর তোমার বুকে চিমটি কেটে জিজ্ঞেস করতে পারে “Is this ‘The’ Time?” হতবিহবল তুমি নিমেষে ঢুকে গেলে কোন মার্সিডিজের সাদা গদিটাতে, হাতে চুরুট। এক হাতে রক্তবর্ণ তরল পিচ্চি গ্লাসে ঘুরপাক খাচ্ছে। রেডিওতে বাজছে  ফিটজেরাল্ড এর ‘Dream a little dream of me’. শহরের উচু দালানের ছায়ায় ঘোর বিকালেও শান্ত বিষন্নতা। টেম্পুর যে হেল্পারটাকে তোমাদের নপুংসতা ঢাকতে অশ্রাব্য ভাষায় ক্ষোভ ঝাড়, সেও রাত বাড়লেই ফিরে যাবে যৎসামান্য বেঁচে থাকার মাশুল নিয়ে। হঠাৎই মার্সিডিজিরে কোমল সিম্ফোনি থেকে মহাখালীর রেলক্রসিংএ। টিং টিং টিং টিং। লাল সাদা ক্যান্ডি বারটা নেমে আসলেই বগিটানা দানবের সম্রাজ্য। ট্রেনে কত কত মুখ, কত চাওয়া, কত হতাশা আর কিছু শূণ্যতা। তুমি? তুমি তো বাইশতলা বিল্ডিংটার রেলিংএ। ক্ষুদ্র মানুষ, বাস, সূক্ষ্ম আলোর ছোটাছুটি, নিয়ন বিজ্ঞাপন এর অনেক উপরে দাঁড়িয়ে পার করে আসা জীবনটাকে অর্থহীন মনে হয়না??

ঘোলাটে চাঁদ টা বেঁচে থাকবেনা আর বেশিদিন। শহর সাজুগুজুতে ব্যস্ত হতে যেয়ে ‘মুনস্লট’ হজম করে ফেলসে। ক্যাপিটালিস্ট দাবীদাওয়ার মুখে বিপন্ন করেছে আমাদের সবুজকে, আমাদের চাঁদটাকে, আমার চাঁদটাকে…

শ তে শিক্ষা আর স তে সৃজনশীল

জাফর ইকবাল স্যারের একটা ব্লগ পড়তেসিলাম। যশোর শিক্ষা বোর্ডের উদ্যোগে তৈরী হয়েছে ‘সৃজনশীল প্রশ্ন ব্যাংক’। প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু শিক্ষা? আমি নিজে খুব নামকরা স্কুল আর কলেজ থেকে লেখাপড়া করেছি। আমরা এমন শিক্ষক চাইনি যাকে অঙ্ক খানিকটা মুখস্থ করে ক্লাস নিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা? সদ্য পাশ করা বড়ভাইদের দেখসি শিক্ষক হতে। অভিজ্ঞতার ঝুলিটা আমার মানিব্যাগের মতই ফাঁকা। প্রাথমিকের উন্নতি হইসে কিনা কে জানে… নাহলে বাচ্চাকাচ্চাগুলোর ভবিষ্যত গড়গড়িয়ে একটা স্কেটবোর্ডে চরে এবড়োথেবড়ো ডাউনফলে এগুবে, যুগে থেকে শতাব্দীতে। তিনি তার ব্লগে সঙ্গায়িত করেছেন ‘সৃজনশীল’ মানে ‘কাঠামোবদ্ধ’। অথচ আমি আসলেই জানতাম এটা হল একটা approach. পড়বে, শিখবে, কাজে লাগাবে। মাঝখানে যেটা না বলা থাকে সেটা হল ‘বোঝা’। বুঝে শিখবে কি? তিনিও কি আসলেই বুঝেছেন আমাদের কিসে ফোকাস করা জরুরী? থিওরীতো সবাই কপচাতে পারে। নির্জীব বইও। তাহলে?

সবাই প্রশ্ন করতে পারে। আমিও করলাম। সমাধান? জানিনা। সমাধান চাই। খাঁটি শিক্ষা নিয়ে বড় হওয়ার গ্যারান্টি চাই। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছেলেটা চাপাতি নিয়ে রাস্তায় নামবেনা। কোন অভিজিৎ রায় মারা যাবেনা। মন্ডপ ধ্বংস করে বাঙালিত্ব দেখাবেনা কোন বীরপুরুষ। এরাও নাকি এসএসসি পাশ। সবই কি এই ‘শিক্ষিত’দের দোষ? শিক্ষকদের কিছু নেই?

বাক্যরা – ১

আজকে বাড়িটা কোথায় যেন চলে গেছে। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিনা। রাস্তার মাথায় এসে চেনা চেনা সিগারেটের দোকানের দিকে তাকাতেই চুল কাটার কচকচ শব্দ। ওটা দশতলা অট্টালিকা এখন। সরু গলিটার অন্য মাথায় ঝুম বৃষ্টি। আর কি অশনি মেঘ। এখানে শুনশান। রাস্তার ডানে তাকাতে তাকাতেই কখন যেন বামদিক থেকে ছুটে আসে মিশুক। মহাখালী ১০ টাকা। গতকালকে সুপার মুন ছিল। সে কি মাতামাতি। তাই আজকের চাঁদটা বোধহয় অভিমান করেই মুখ শুকায়ে আছে। কামাল মামার চায়ে ডুবায়ে টুপ করে গিলে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছিল চাঁদটাকে। অস্থিরতা। সকাল হচ্ছে।

সাড়ে ৯টার ক্লাসের জন্য ৮টার ভাইটাল ঘুমকে কাচকলা দেখায় ক্যাম্পাসে  যাওয়া মেয়েটা আলাভোলা ছেলেটাকে চুমু খেতে কি ভেবেছিল কর্পোরেট বটগাছে বেয়ে উঠার দড়ি সবাই খুঁজে পায়না? কত দামে বিক্রি হয়  সিএনজির ঘোরটোপে ঘোরলাগা দৃষ্টি?

“জানো তোমার মতই আমি হাতড়ে বেড়াই, জেনো তোমার মতই আমারও বন্ধু একটা চাই”।
তাই
“ধুত্তোরি ছাই,
তাই হাওয়ায় উড়াই,
শহরের জমে থাকা গান”

শেষমেশ বাসা খুজঁতে ভাসা ভাসা চোখে হলুদ, নীল আর গোলাপি বেলুন দেখি। এই যাহ। ফোলা গালে পিচ্চিটার ফসকে যাওয়া বেলুন উড়ে চলে। আরো দূরে। আরো সরে সরে যায়। আমার বাড়িটার খোঁজে।

হলুদ পালকটা সবুজ ঘাসে

”let your mercy spill on all these burning hearts in hell”

রাস্তার মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে যখন দু’পাশে সারি সারি ল্যাম্পপোস্ট দেখি, তাদের নেমে আসা সাদাটে আলোর শব্দে শহরের কোলাহল ঢাকা পরেনা ঠিকই, ফাঁকা ফাঁকা অনুভূতিটা কিন্তু একরকম। ওই  লাল-সবুজ চিরুনী বিক্রি করা মানুষটার মতই। ওভারব্রীজের রেলিং এ বসা শামুকটাও ভয় চোখে দেখে সারি সারি অভিজাত আলোর ছুটে চলা। ওভারব্রীজের মাঝামাঝি একটা বিছানাতে ঘর জ্বলে নিঃস্ব হওয়া সাওতাঁল ছেলেটারও জায়গা হয়ে যাবে। বুটের শব্দে চমকে লাফিয়ে পার হয়ে যায় চোর বিড়ালটা। সকালের কাগজ পড়ার সময় পায়নি। ভাজা মাছটা উলটে দিতে না দিতেই একেবারে নায়েব মহাশয়ের চিঠি। খায়েশ হয়েছে কিছু সবুজ তার হোক। দাদাও সকাল সকাল বললেন কিছু সরপুটি ভেজে দিতে। বড়শিটার মন খারাপ ছিল গতকিছুদিন। চাকরী তো… সয়ে গেছে। এখনো তাই সদ্য হলুদ পাতারা আকাশ পানে চেয়ে। জ্বলুক… কিছু জ্বলুক। ঝরে পরুক। উড়ুক। ভিজুক। বেঁচে থাকুক? কে চায়?